"রক্তে রঞ্জিত অমরএকুশ: ভাষার জন্য আত্মত্যাগের কথা"
একটি জাতির চেতনায় ভাষার গুরুত্ব কতটা গভীরভাবে প্রোথিত, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলা ভাষা আন্দোলন। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে, ভাষার প্রতি অনুরাগ থেকেই বঙ্গীয় সমাজে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় শুরু হয় ভাষা-বিক্ষোভ।
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে আন্দোলন সীমিত পরিসরে হলেও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলে। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এ আন্দোলন চরম রূপ ধারণ করে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক শাসনের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। মাতৃভাষার দাবিতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালামসহ আরো কয়েকজন অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করেন। বুলেটবিদ্ধ রাজপথ সাক্ষী হয়ে থাকে এক অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের।
শহীদের রক্তে উদ্দীপ্ত ঢাকাবাসী থেমে থাকেনি। ২২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে, শহীদদের স্মরণে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করে। এক রাতের মধ্যেই, ২৩ ফেব্রুয়ারি, শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে এক স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সে স্মৃতিস্তম্ভ চির অমলিন থেকে যায়।
এই আত্মত্যাগের ধারায় ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর, ৭ মে গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংবিধানে সংশোধনী এনে বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
শুধু এখানেই থেমে থাকেনি ভাষার বিজয়। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল হিসেবে ১৯৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে পাশ হয় 'বাংলা ভাষা প্রচলন বিল', যা কার্যকর হয় ৮ মার্চ ১৯৮৭ সাল থেকে।
এ এক বিজয়ের গল্প, আত্মত্যাগের অমর মহাকাব্য। শহীদের রক্তে রাঙানো একুশ আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের ভাষাপ্রেমীদের প্রেরণা। সেই আত্মদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, যা বাঙালির ভাষাচেতনার অবিনশ্বর গৌরবচিহ্ন।
